ঢাকা ০৫:৪১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বিজিবি’র বিশেষ অভিযানে বিরলের সীমান্তে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মদ উদ্ধার কমিশনের ‘রাজত্ব’ ও অন্তহীন অনিয়ম : কে এই রমজান আলী? তারালী ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারন সম্পাদক গনিয়ার রহমান গনি’র বিরুদ্ধে মিথ্যাচারে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ শার্শায় যৌথ টাস্কফোর্সের অভিযানে ডিজেল জব্দ, ২জনকে জরিমানা রেল ডিজিকে হঠাতে মাঠে বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা রমজান, নেপথ্যে ‘পাথর সিন্ডিকেটের’ স্বার্থ রামেকের ‘ফ্যাসিস্ট দোসর’ কর্মকর্তাদের অপসারণ চাই : ফুঁসে উঠেছে রাজশাহীবাসী বৈশাখে এলো তাদের ‘পান্তা ইলিশ’ রাজশাহী থেকে ঢাকা, শেষে চট্টগ্রাম—অভিযানে অপহরণকারী গ্রেফতার, ভিকটিম উদ্ধার নাচ থেকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা, সোনিয়া রায়ের অনুপ্রেরণার গল্প পীরগঞ্জে নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা

কমিশনের ‘রাজত্ব’ ও অন্তহীন অনিয়ম : কে এই রমজান আলী?

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ১০:১৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ৬৫ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) মো. রমজান আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

সরকারি চাকরিতে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত শত কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে ২০২২ সালের জুলাই মাসে তাকে সরকারি সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে চাকরি হতে বরখাস্ত করা হয়। তবে বরখাস্ত হলেও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ও মামলার কার্যক্রম এখনো চলমান।

​তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজশাহী থাকাকালীন রমজান আলী প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিনা টেন্ডারে এলটিএম (LTM) পদ্ধতিতে কয়েকশ কোটি টাকার কাজ তার পছন্দের ঠিকাদারদের পাইয়ে দেন। বিশেষ করে ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে তিনি ব্যাপক অনিয়ম করেন। এই অনিয়মের কারণে বাজেটের বাইরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার টেন্ডার করা হয়, যার বিলের দায়ভার এখনো রেলওয়ে বিভাগ বহন করছে।

​অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির সমালোচনা থেকে বাঁচতে রেললাইনের কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়াই তিনি জয়দেবপুর-পার্বতীপুর সেকশনে ট্রেনের গতি ৯০ কিমি থেকে ১০০ কিমিতে উন্নীত করেন। প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া এই গতি বৃদ্ধির ফলে রেললাইনে ফাটল দেখা দেয় এবং কংক্রিট স্লিপার ভাঙতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে সান্তাহার সেকশনে রেললাইনের ফাটলজনিত কারণে ‘নীলসাগর’ ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা রেল চলাচল বন্ধ থাকে।

​দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রমজান আলীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একাধিক মামলা (মামলা নং ৭ ও ৮, তারিখ: ১৬/০৮/২০২০) দায়ের করেছে। তার ও তার স্ত্রী দিলরুবা পারভীনের নামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুদক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

​বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা: এইচ ব্লকের ৬ নম্বর রোডে ৩ কাঠা জমির ওপর ৬ তলা আলিশান বাড়ি। এছাড়া আরও ৩ কাঠা ও ৩.৫ কাঠার দুটি প্লট।

​আঞ্চলিক সম্পদ: জামালপুরের সিংজানি মৌজায় জমি ও ৫ তলা আবাসিক ভবন এবং পাবনায় ২১ শতাংশ জমি।

​আর্থিক লেনদেন: ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ। এছাড়া রয়েছে বিলাসবহুল প্রাইভেট কার (ঢাকা মেট্রো-ঘ ২৯-৩৪৮২), দামী আসবাবপত্র ও স্বর্ণালঙ্কার।

​আদালত ইতিমধ্যে তার বসুন্ধরার বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দিলেও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি এখনো তা কার্যকর হতে দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

​পেশাগত দুর্নীতির পাশাপাশি রমজান আলীর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন ও একাধিক বিয়ে সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। রাজশাহীর বহরমপুর এলাকার শোভা খাতুন নামে এক নারী তার বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা ও সামাজিক চাপে বিয়ে করার পর ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগে মামলা (পি-২৭/২০১৯) করেছেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন।

​দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারানো সত্ত্বেও রমজান আলী পরবর্তীতে যমুনা রেল সেতু ও মেট্রোরেল প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার অদক্ষতা ও দুর্নীতির রেকর্ড সামনে আসায় সেখান থেকেও তাকে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি ভুয়া প্রেসক্রিপশন ও অসুস্থতার দোহাই দিয়ে আদালতের বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

রেলওয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের দাবি জোরালো হচ্ছে।

​এ বিষয়ে জানতে চাইলে রমজান আলী বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো প্রমাণ হয়নি।” এরপর আর কোনো কথা না বলেই তিনি ফোন কেটে দেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

কমিশনের ‘রাজত্ব’ ও অন্তহীন অনিয়ম : কে এই রমজান আলী?

আপডেট সময় : ১০:১৭:১৭ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ের অন্যতম শীর্ষ দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) মো. রমজান আলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

সরকারি চাকরিতে থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, শত শত কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে ২০২২ সালের জুলাই মাসে তাকে সরকারি সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে চাকরি হতে বরখাস্ত করা হয়। তবে বরখাস্ত হলেও তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত ও মামলার কার্যক্রম এখনো চলমান।

​তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজশাহী থাকাকালীন রমজান আলী প্রধান প্রকৌশলী (পশ্চিম) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিনা টেন্ডারে এলটিএম (LTM) পদ্ধতিতে কয়েকশ কোটি টাকার কাজ তার পছন্দের ঠিকাদারদের পাইয়ে দেন। বিশেষ করে ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে ১০ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে তিনি ব্যাপক অনিয়ম করেন। এই অনিয়মের কারণে বাজেটের বাইরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার টেন্ডার করা হয়, যার বিলের দায়ভার এখনো রেলওয়ে বিভাগ বহন করছে।

​অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির সমালোচনা থেকে বাঁচতে রেললাইনের কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়াই তিনি জয়দেবপুর-পার্বতীপুর সেকশনে ট্রেনের গতি ৯০ কিমি থেকে ১০০ কিমিতে উন্নীত করেন। প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া এই গতি বৃদ্ধির ফলে রেললাইনে ফাটল দেখা দেয় এবং কংক্রিট স্লিপার ভাঙতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৮ মার্চ ২০২৬ তারিখে সান্তাহার সেকশনে রেললাইনের ফাটলজনিত কারণে ‘নীলসাগর’ ট্রেন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে এবং দীর্ঘ ২১ ঘণ্টা রেল চলাচল বন্ধ থাকে।

​দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রমজান আলীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে একাধিক মামলা (মামলা নং ৭ ও ৮, তারিখ: ১৬/০৮/২০২০) দায়ের করেছে। তার ও তার স্ত্রী দিলরুবা পারভীনের নামে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুদক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

​বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা: এইচ ব্লকের ৬ নম্বর রোডে ৩ কাঠা জমির ওপর ৬ তলা আলিশান বাড়ি। এছাড়া আরও ৩ কাঠা ও ৩.৫ কাঠার দুটি প্লট।

​আঞ্চলিক সম্পদ: জামালপুরের সিংজানি মৌজায় জমি ও ৫ তলা আবাসিক ভবন এবং পাবনায় ২১ শতাংশ জমি।

​আর্থিক লেনদেন: ইসলামী ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক এবং ব্র্যাক ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা এবং মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ। এছাড়া রয়েছে বিলাসবহুল প্রাইভেট কার (ঢাকা মেট্রো-ঘ ২৯-৩৪৮২), দামী আসবাবপত্র ও স্বর্ণালঙ্কার।

​আদালত ইতিমধ্যে তার বসুন্ধরার বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পদ ক্রোকের নির্দেশ দিলেও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তিনি এখনো তা কার্যকর হতে দেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

​পেশাগত দুর্নীতির পাশাপাশি রমজান আলীর বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলন ও একাধিক বিয়ে সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গেছে। রাজশাহীর বহরমপুর এলাকার শোভা খাতুন নামে এক নারী তার বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা ও সামাজিক চাপে বিয়ে করার পর ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগে মামলা (পি-২৭/২০১৯) করেছেন, যা বর্তমানে বিচারাধীন।

​দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারানো সত্ত্বেও রমজান আলী পরবর্তীতে যমুনা রেল সেতু ও মেট্রোরেল প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার অদক্ষতা ও দুর্নীতির রেকর্ড সামনে আসায় সেখান থেকেও তাকে বাদ দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি ভুয়া প্রেসক্রিপশন ও অসুস্থতার দোহাই দিয়ে আদালতের বিচারিক কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছেন বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

রেলওয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের দাবি জোরালো হচ্ছে।

​এ বিষয়ে জানতে চাইলে রমজান আলী বলেন, “আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো প্রমাণ হয়নি।” এরপর আর কোনো কথা না বলেই তিনি ফোন কেটে দেন।