ঢাকা ০৯:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ২৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মধুপুরে দুর্নীতিবিরোধী বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠিত স্যানিটারী ইন্সপেক্টর সেমাজুল হকের বিরুদ্ধে ড্রেনেজ অব্যবস্থাপনা ও জন্মনিবন্ধন সংশোধনে অর্থ আদায়ের অভিযোগ মধুপুরের অরণখোলা ইউনিয়নে বিট পুলিশিং সভা অনুষ্ঠিত  পীরগঞ্জে ৪২২ পিস ইয়াবাসহ দুই ব্যবসায়ী আটক মধুপুরের আউশনারা ইউনিয়নে বিট পুলিশিং সভা অনুষ্ঠিত টাঙ্গাইলের মধুপুরে বিট পুলিশিং সভা অনুষ্ঠিত মানবিকতার জয়গান, রাজশাহীতে ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবার ঘোষণা বিরলে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সুফল ভোগীদের মাঝে ছাগল ও উপকরন বিতরণ বিরলে নোনাখাড়ি পুনঃ খননের উদ্বোধন পীরগঞ্জে অগ্নিকাণ্ড ও ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে ঢেউ টিন বিতরণ

একা মঞ্চে আত্মদর্শনের যাত্রা: ‘ভাসানে উজান’-এ উজ্জ্বল এরশাদ হাসান

হৃদয় খান
  • আপডেট সময় : ০৫:০৫:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ৫৫ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বিবেকানন্দ থিয়েটারের ২৫তম প্রযোজনা ‘ভাসানে উজান’ সম্প্রতি স্টুডিও থিয়েটারে মঞ্চে আসার পর থেকেই আলোচনায় এর একক অভিনয়শিল্পী মো. এরশাদ হাসান। দস্তয়েভস্কির বিখ্যাত ছোটগল্প দ্য জেন্টল স্পিরিট অবলম্বনে অপূর্ব কুমার কুণ্ডুর নাট্যরূপ এবং শুভাশীষ দত্ত তন্ময়ের নির্দেশনায় তৈরি নাটকটি প্রথম প্রদর্শনেই দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এরশাদের মতে, এ নাটক শুধু তাঁর অভিনয়জীবনের নতুন অধ্যায়ই নয়, বরং বাংলাদেশের সমকালীন নাট্যমঞ্চে একক অভিনয়ের সম্ভাবনাকেও নতুন করে সামনে এনেছে।
গল্পটি প্রথম পড়েই অভিনেতাকে আকৃষ্ট করেছিল মানুষের আত্মার নিঃশব্দ ক্ষরণের দিকটি। মানুষের বাইরের হাসিমুখ আর ভেতরের গভীর অন্ধকার—এই দ্বৈত সত্তার টানাপোড়েন তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বুঝেছিলেন, চরিত্রের যন্ত্রণা, অপরাধবোধ ও মানবিক দ্বন্দ্ব এতটাই অন্তর্মুখী যে তা একাই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলাই শ্রেয়। তাই একক অভিনয়কে ঘিরে তাঁর যাত্রা শুরু হয় নিজের ভেতরেই।
একাই পুরো মঞ্চ সামলানো যে সহজ নয় তা জানতেন এরশাদ। তার কথায়, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মঞ্চ দখল নয়, বরং মঞ্চ ধরে রাখা। দর্শকের প্রতিটি চোখ, প্রতিক্রিয়া, নীরবতা—সবই তার দিকে। তাই ভুল করার সুযোগ নেই, ক্লান্ত হওয়ারও জায়গা নেই। তবে তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে নাট্যরূপকার অপূর্ব কুমার কুণ্ডুর গভীর মানবিক গল্প আর নির্দেশক তন্ময়ের নির্ভুল মঞ্চদৃষ্টি। তাঁদের বিশ্বাস থেকেই তিনি নিজের প্রতি বিশ্বাস পেয়েছেন।
নাটকটির জন্য নিজের প্রস্তুতির কথা বলতে গিয়ে এরশাদ জানান, তাঁকে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে তিনভাবে—মানসিক, শারীরিক এবং নীরবতার অনুশীলন দিয়ে। প্রথমেই শূন্য করেন নিজেকে, যাতে চরিত্রের অপরাধবোধ, লজ্জা, ভালোবাসা নিজের ভেতর ধারণ করতে পারেন। তারপর দেহভাষার ওপর দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব, কারণ একক নাটকে দেহই হয়ে ওঠে প্রধান ভাষা। তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল নীরবতা—দীর্ঘ নীরবতা ধরে রেখেও দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা ছিল একক অভিনয়ের আসল পরীক্ষা।
নাটকের ভাষা তৈরির ক্ষেত্রেও হয়েছে দীর্ঘ চর্চা। বাড়তি সংলাপ কমিয়ে শব্দ, আলো, দেহভঙ্গি আর নীরবতা—সবকিছুকে আলাদা ভাষা হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। নির্দেশক তন্ময় বারবারই বলেছেন, “ডায়ালগের আগে চোখ যেন কথা বলে”—এ নির্দেশই শেষ পর্যন্ত নাটকের পরিবেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির জায়গাটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এরশাদের মতে, তিনি দর্শককে কল্পনা করেছেন এক ধরনের নিঃশব্দ বিচারক হিসেবে। তিনি যখন চরিত্র হয়ে নিজের ভুল, বেদনা, অপরাধবোধ স্বীকার করেন, মনে হয় যেন নিজের অন্তরকেই বলছেন, আর সেই অন্তরের কথাই শুনছেন দর্শক। এই অন্তরঙ্গ অনুভূতিই নাটকের আবহে দর্শককে টেনে এনেছে।
দলীয় নাট্যচর্চা থেকে হঠাৎ একা মঞ্চে দাঁড়ানো—এই অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছে নিজেকে। একা অভিনয়ে অন্য কারো ওপর ভরসা থাকে না, তাই নিজের শক্তি, মনোযোগ আর আত্মবিশ্বাসই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সঙ্গী। তাঁর ভাষায়, একা মঞ্চ আসলে নিজের সঙ্গে এক গোপন সংলাপ।
সবশেষে ‘ভাসানে উজান’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এরশাদ জানান, এই নাটক তাঁকে ভেতর থেকে নতুন জন্ম দিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, একক নাটক বাংলাদেশের সমকালীন থিয়েটারে নতুন ভাষা তৈরি করতে পারে। মঞ্চে একা দাঁড়ানো যেমন শিল্পীর স্বাধীনতাকে বাড়ায়, তেমনি দর্শকের মনোযোগও আরও নিবিড় হয়- এ দুয়ের মিলেই তৈরি হতে পারে আরও গভীর মানবিক নাট্যরূপ।
‘ভাসানে উজান’ তাই শুধু একটি নাটক নয়; এটি এক তরুণ অভিনেতার আত্মদর্শন, লড়াই এবং নতুন দিগন্তের অভিমুখে তৈরি এক সাহসী পদক্ষেপ।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

একা মঞ্চে আত্মদর্শনের যাত্রা: ‘ভাসানে উজান’-এ উজ্জ্বল এরশাদ হাসান

আপডেট সময় : ০৫:০৫:২৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর ২০২৫

বিবেকানন্দ থিয়েটারের ২৫তম প্রযোজনা ‘ভাসানে উজান’ সম্প্রতি স্টুডিও থিয়েটারে মঞ্চে আসার পর থেকেই আলোচনায় এর একক অভিনয়শিল্পী মো. এরশাদ হাসান। দস্তয়েভস্কির বিখ্যাত ছোটগল্প দ্য জেন্টল স্পিরিট অবলম্বনে অপূর্ব কুমার কুণ্ডুর নাট্যরূপ এবং শুভাশীষ দত্ত তন্ময়ের নির্দেশনায় তৈরি নাটকটি প্রথম প্রদর্শনেই দর্শকের প্রশংসা কুড়িয়েছে। এরশাদের মতে, এ নাটক শুধু তাঁর অভিনয়জীবনের নতুন অধ্যায়ই নয়, বরং বাংলাদেশের সমকালীন নাট্যমঞ্চে একক অভিনয়ের সম্ভাবনাকেও নতুন করে সামনে এনেছে।
গল্পটি প্রথম পড়েই অভিনেতাকে আকৃষ্ট করেছিল মানুষের আত্মার নিঃশব্দ ক্ষরণের দিকটি। মানুষের বাইরের হাসিমুখ আর ভেতরের গভীর অন্ধকার—এই দ্বৈত সত্তার টানাপোড়েন তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বুঝেছিলেন, চরিত্রের যন্ত্রণা, অপরাধবোধ ও মানবিক দ্বন্দ্ব এতটাই অন্তর্মুখী যে তা একাই মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলাই শ্রেয়। তাই একক অভিনয়কে ঘিরে তাঁর যাত্রা শুরু হয় নিজের ভেতরেই।
একাই পুরো মঞ্চ সামলানো যে সহজ নয় তা জানতেন এরশাদ। তার কথায়, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মঞ্চ দখল নয়, বরং মঞ্চ ধরে রাখা। দর্শকের প্রতিটি চোখ, প্রতিক্রিয়া, নীরবতা—সবই তার দিকে। তাই ভুল করার সুযোগ নেই, ক্লান্ত হওয়ারও জায়গা নেই। তবে তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে নাট্যরূপকার অপূর্ব কুমার কুণ্ডুর গভীর মানবিক গল্প আর নির্দেশক তন্ময়ের নির্ভুল মঞ্চদৃষ্টি। তাঁদের বিশ্বাস থেকেই তিনি নিজের প্রতি বিশ্বাস পেয়েছেন।
নাটকটির জন্য নিজের প্রস্তুতির কথা বলতে গিয়ে এরশাদ জানান, তাঁকে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে তিনভাবে—মানসিক, শারীরিক এবং নীরবতার অনুশীলন দিয়ে। প্রথমেই শূন্য করেন নিজেকে, যাতে চরিত্রের অপরাধবোধ, লজ্জা, ভালোবাসা নিজের ভেতর ধারণ করতে পারেন। তারপর দেহভাষার ওপর দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব, কারণ একক নাটকে দেহই হয়ে ওঠে প্রধান ভাষা। তবে সবচেয়ে কঠিন ছিল নীরবতা—দীর্ঘ নীরবতা ধরে রেখেও দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা ছিল একক অভিনয়ের আসল পরীক্ষা।
নাটকের ভাষা তৈরির ক্ষেত্রেও হয়েছে দীর্ঘ চর্চা। বাড়তি সংলাপ কমিয়ে শব্দ, আলো, দেহভঙ্গি আর নীরবতা—সবকিছুকে আলাদা ভাষা হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে। নির্দেশক তন্ময় বারবারই বলেছেন, “ডায়ালগের আগে চোখ যেন কথা বলে”—এ নির্দেশই শেষ পর্যন্ত নাটকের পরিবেশ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির জায়গাটিও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এরশাদের মতে, তিনি দর্শককে কল্পনা করেছেন এক ধরনের নিঃশব্দ বিচারক হিসেবে। তিনি যখন চরিত্র হয়ে নিজের ভুল, বেদনা, অপরাধবোধ স্বীকার করেন, মনে হয় যেন নিজের অন্তরকেই বলছেন, আর সেই অন্তরের কথাই শুনছেন দর্শক। এই অন্তরঙ্গ অনুভূতিই নাটকের আবহে দর্শককে টেনে এনেছে।
দলীয় নাট্যচর্চা থেকে হঠাৎ একা মঞ্চে দাঁড়ানো—এই অভিজ্ঞতা তাঁকে নতুনভাবে চিনতে শিখিয়েছে নিজেকে। একা অভিনয়ে অন্য কারো ওপর ভরসা থাকে না, তাই নিজের শক্তি, মনোযোগ আর আত্মবিশ্বাসই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় সঙ্গী। তাঁর ভাষায়, একা মঞ্চ আসলে নিজের সঙ্গে এক গোপন সংলাপ।
সবশেষে ‘ভাসানে উজান’ সম্পর্কে বলতে গিয়ে এরশাদ জানান, এই নাটক তাঁকে ভেতর থেকে নতুন জন্ম দিয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, একক নাটক বাংলাদেশের সমকালীন থিয়েটারে নতুন ভাষা তৈরি করতে পারে। মঞ্চে একা দাঁড়ানো যেমন শিল্পীর স্বাধীনতাকে বাড়ায়, তেমনি দর্শকের মনোযোগও আরও নিবিড় হয়- এ দুয়ের মিলেই তৈরি হতে পারে আরও গভীর মানবিক নাট্যরূপ।
‘ভাসানে উজান’ তাই শুধু একটি নাটক নয়; এটি এক তরুণ অভিনেতার আত্মদর্শন, লড়াই এবং নতুন দিগন্তের অভিমুখে তৈরি এক সাহসী পদক্ষেপ।