ঢাকা ০৯:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ২৭ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মায়ের হাত ধরে নাচ, কার্টুনের কণ্ঠ থেকে ভয়েসওভার: জয়িতার গল্প জিম্মি বন্দি, বাধ্য স্বজন : রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে কারারক্ষী রাসেলের ত্রাস অল্প বয়সেই একের পর এক সাফল্য, আইপা অ্যাওয়ার্ড জিতল আনাহিতা জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের গল্প নিয়ে নিউইয়র্কে ‘বিশ্বাস করেন ভাই’ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের জন্য বহুমুখী ওপেন মার্কেটপ্লেস টেকসই উন্নয়ন ও মানবসেবার প্রত্যয়ে ‘সি ফাউন্ডেশন’-এর পথচলা ​নাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, পরিচয় ‘সাংবাদিক’ : বরেন্দ্র প্রেসক্লাবে হামলায় যুবলীগ কর্মী জেলে নারীদের নিয়ে বড় স্বপ্ন, সেরা উদ্যোক্তার সম্মাননা পেলেন আফরোজা দেশের প্রথম মাইগ্রেশন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল–২০২৬ অফিসিয়াল সিলেকশনে ‘বৈদেশ’ উমারপুর ইউনিয়নকে আধুনিক ও মডেল হিসেবে গড়তে চান চেয়ারম্যান প্রার্থী কামরুল ইসলাম মন্ডল

মায়ের হাত ধরে নাচ, কার্টুনের কণ্ঠ থেকে ভয়েসওভার: জয়িতার গল্প

হৃদয় খান
  • আপডেট সময় : ০২:২০:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নাচে পুরস্কার, কণ্ঠে পরিচয়: জয়িতা রশীদের দুই জগতের গল্প

ছোটবেলা থেকেই নাচের সঙ্গে পথচলা। পাশাপাশি কণ্ঠ অনুকরণের সহজাত দক্ষতা থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে ভয়েসওভার শিল্পী হিসেবে আলাদা পরিচয়। শিল্পের এই দুই ভিন্ন মাধ্যমে নিজের প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন জয়িতা রশীদ। গ্রামের বাড়ি খুলনায় হলেও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। সম্প্রতি নাচের জন্য ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’-এ সম্মানিত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন পর কোনো নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হয়ে পাওয়া এই স্বীকৃতি তার কাছে হয়ে উঠেছে বিশেষ এক অর্জন।
পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে জয়িতা বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, অনুভূতিটা সত্যিই অসাধারণ। আসলে আমি আগে থেকে জানতামই না যে কোনো প্রতিযোগিতা হতে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতার আগের দিন রাতে জানতে পেরেছিলাম এবং কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই অংশগ্রহণ করেছিলাম। তাই কোনো প্রত্যাশা না রেখেই যখন প্রথম হয়েছি এবং এই সম্মাননাটি পেয়েছি, তখন আনন্দটা সত্যিই অন্যরকম ছিল। আমার দীর্ঘদিনের নাচের চর্চার জন্য এমন একটি স্বীকৃতি পাওয়াটা আমার জন্য অনেক আনন্দ ও গর্বের মুহূর্ত।
জয়িতার নাচের শুরু আরও অনেক আগে। মাত্র তিন বছর দুই মাস বয়সে তার নাচ শেখার যাত্রা শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল তার মায়ের। তিনিই ছিলেন জয়িতার নাচের প্রথম শিক্ষক এবং তাকে নাচ শেখানোর ব্যাপারে শুরু থেকেই আগ্রহী ছিলেন।
তবে শৈশবে নাচের প্রতি জয়িতার আগ্রহ খুব একটা ছিল না। বরং নৃত্যগুরুকে ভয় পেতেন, ক্লাসে যেতে চাইতেন না, এমনকি অনেক সময় কান্নাও করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সেই অবস্থান। ধীরে ধীরে নাচের সঙ্গে তৈরি হয় গভীর সম্পর্ক। একটা সময় বুঝতে পারেন, নৃত্য শুধু তার জন্য একটি শিল্প নয়, এটি নিজেকে প্রকাশ করারও একটি মাধ্যম। নাচের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি, আনন্দ ও ভালো লাগা প্রকাশ করতে পারেন তিনি। মঞ্চে নাচার সময় যে আনন্দ ও আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন, সেটি অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করাও কঠিন।
নাচের পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই কণ্ঠ অনুকরণের প্রতিও ছিল তার আলাদা আগ্রহ। বিশেষ করে কার্টুন চরিত্রগুলো তাকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। ঘুম থেকে উঠে কার্টুন দেখা, খেতে বসে কার্টুন দেখা, আর প্রিয় চরিত্রগুলোর কণ্ঠ অনুকরণ করে তা মা, বাবা, ভাই-বোনদের শুনিয়ে আনন্দ পাওয়া ছিল তার শৈশবের অন্যতম অভ্যাস। মা তখনই তাকে উৎসাহ দিতেন এবং আরও ভালোভাবে অনুকরণ করার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। তবে তখন জয়িতা বুঝতে পারেননি, এই শখ একদিন তার পেশাগত পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠবে।
২০২০ সালে করোনাকালে সেই শখই নতুন মোড় নেয়। অনলাইনে একটি প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর কণ্ঠ অনুকরণ করে অনেককে অংশ নিতে দেখেন জয়িতা। তার চোখে পড়ে, কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ নিয়ে তেমন কেউ অংশ নিচ্ছেন না। তখন নিজের ছোটবেলার অভ্যাসকে কাজে লাগিয়ে তিনিও অংশ নেওয়ার কথা ভাবেন।
তবে সাহস পাচ্ছিলেন না। কারণ প্রতিযোগিতায় অনেকেই ছিলেন পেশাদার, আর জয়িতা ছিলেন নিজের আগ্রহ থেকে শেখা একজন। তার ওপর কোনো কিছু করলে প্রথম হওয়ার একটা মানসিকতাও ছিল। শেষ পর্যন্ত মায়ের উৎসাহেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। মা ক্যামেরা ধরে দেন, আর জয়িতা তৈরি করেন তার প্রথম ভিডিও। অবাক করার মতোভাবে প্রথম ভিডিওতেই ভালো সাড়া পান। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ভিডিও করতে করতে মানুষের ভালোবাসা ও উৎসাহ বাড়তে থাকে। এভাবেই শখ থেকে ধীরে ধীরে তার ভয়েসওভার শিল্পী হিসেবে পেশাগত পথচলা শুরু হয়।
ভয়েসওভারকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে মায়ের অনুপ্রেরণা। ছোটবেলার একটি স্বপ্নের কথাও জানান জয়িতা। কোনো একটি কার্টুন চরিত্রের আনুষ্ঠানিক কণ্ঠ দেওয়ার ইচ্ছা তার দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য শিল্পীরাও যেন তার কণ্ঠ বা তার তৈরি কোনো চরিত্রের কণ্ঠ অনুকরণ করেন, এমন স্বপ্নও দেখেন তিনি। ছোটবেলায় যেমন অন্যদের কণ্ঠ অনুকরণ করে আনন্দ পেতেন, তেমনি একদিন তার কণ্ঠও যেন অন্য কারও অনুপ্রেরণার কারণ হয়, সেটিই তার প্রত্যাশা।
জয়িতার মতে, একজন ভয়েসওভার শিল্পীর জন্য শুধু সুন্দর কণ্ঠস্বর থাকাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন অভিনয় ও আবেগ প্রকাশের দক্ষতা। কারণ ভয়েসওভারে শুধু কথা বললেই হয় না, কণ্ঠের মাধ্যমে সেই অনুভূতিটাও শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে হয়। কোনো দুঃখের বিষয় স্বাভাবিকভাবে কিংবা হাসতে হাসতে বললে সেখানে সেই দুঃখের অনুভূতি ফুটে উঠবে না। আবার আনন্দময় কোনো কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ দেওয়ার সময় কণ্ঠে আনন্দ, উচ্ছ্বাস বা সঠিক এক্সপ্রেশন না থাকলে চরিত্রটিও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে না। তাই তার কাছে ভয়েসওভার মানে শুধু কণ্ঠ দিয়ে কথা বলা নয়, বরং কণ্ঠের মাধ্যমে অভিনয় করা।
ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র বা পরিস্থিতিতে কণ্ঠের পরিবর্তনেও তার ছোটবেলার সংগীতচর্চা ভূমিকা রেখেছে। নাচের পাশাপাশি তিনি গানও শিখেছেন সুজিত মোস্তফার কাছে। নিয়মিত রেওয়াজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ভোকাল রেঞ্জে কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণের চর্চা করতেন। কখনো উচ্চস্বর, কখনো নিচু স্বরে কণ্ঠ নিয়ে যাওয়ার সেই অনুশীলন পরবর্তীতে ভয়েসওভারে কাজে দিয়েছে। ফলে বিভিন্ন চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠের টোন, পিচ ও ভঙ্গি পরিবর্তন করা তার জন্য তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
তবে ভয়েসওভারের জগতে পথচলাটাও পুরোপুরি সহজ ছিল না। জয়িতার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ, উপযুক্ত আবেগ, এক্সপ্রেশন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরো স্ক্রিপ্ট ঠিকভাবে উপস্থাপন করা। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করায় ছোটবেলা থেকে বাংলা চর্চা তুলনামূলক কম ছিল। ফলে বাংলা শব্দের সঠিক উচ্চারণ, বিশেষ করে কিছু কঠিন শব্দ আয়ত্ত করতে তাকে বাড়তি অনুশীলন করতে হয়েছে। এখন কোনো নতুন বা কঠিন স্ক্রিপ্ট হাতে এলে আগে উচ্চারণগুলো ঠিক করে নেন। এরপর কোথায় বিরতি দিতে হবে, কোন শব্দে কতটা জোর দিতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কী ধরনের আবেগ প্রয়োজন, সেগুলো ঠিক করে স্ক্রিপ্ট উপস্থাপন করেন।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কণ্ঠ তৈরি ও অনুকরণ নিয়ে আলোচনা বাড়লেও বিষয়টিকে শুধুই হুমকি হিসেবে দেখছেন না জয়িতা। তার মতে, প্রযুক্তি একটি কণ্ঠকে কাছাকাছি অনুকরণ করতে পারলেও একজন মানুষের মতো করে চরিত্রের পরিস্থিতি ও অনুভূতি ধারণ করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করার জায়গাটি আলাদা। মানুষের আবেগ, অভিনয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তিই একজন পেশাদার ভয়েসওভার শিল্পীকে আলাদা করে বলে মনে করেন তিনি।
নাচ ও ভয়েসওভার, দুটি মাধ্যমকে আলাদা হলেও এর মূল জায়গায় মিল খুঁজে পান জয়িতা। তার ভাষায়, “আমি যখন নাচি, তখন আমার শরীর কথা বলে; আর যখন ভয়েসওভার করি, তখন আমার কণ্ঠ কথা বলে।” নাচে শরীরের মুভমেন্ট, মুখের অভিব্যক্তি ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ করেন, আর ভয়েসওভারে একই কাজ করেন কণ্ঠের ওঠানামা, টোন ও আবেগ দিয়ে। তার কাছে নাচ ও ভয়েসওভার আলাদা দুটি জগৎ হলেও দুটির কেন্দ্রেই রয়েছে অভিব্যক্তি ও অনুভূতি।
তবে ভয়েসওভার করার অভিজ্ঞতা তার নাচের পরিবেশনায় সরাসরি বড় কোনো প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন না তিনি। দুটো মাধ্যমকে আলাদাভাবেই দেখেন জয়িতা। তার কাছে একটির অভিজ্ঞতা অন্যটির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়।
পেশাগত ও পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যেও নাচের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্লাস থাকে। মাঝখানে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মতো সময় পেলেই সেই অবসরটুকু আড্ডায় না কাটিয়ে নাচের অনুশীলন কিংবা ডান্স ভিডিও তৈরিতে কাজে লাগান। তার বিশ্বাস, নাচের জন্য সবসময় দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট অবসর সময়কেও কাজে লাগিয়ে চর্চা ধরে রাখা সম্ভব।
নাচের প্রতিযোগিতার সঙ্গেও জয়িতার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। তবে প্রায় চার বছর আগে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অনেকটাই বন্ধ করে দেন। এর পেছনে রয়েছে তার নৃত্যগুরুর একটি কথা। একসময় গুরু তাকে বলেছিলেন, জয়িতা, তুই আর কত প্রতিযোগিতা করবি? অনেক পুরস্কার তো পেয়েছিস, এবার অন্যদেরও সুযোগ দে।
কথাটি জয়িতার মনে দাগ কাটে। এরপর নতুন যারা আসছে তাদেরও সামনে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। ফলে প্রতিযোগিতার মঞ্চ থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন। এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াটাও ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক। প্রতিযোগিতার বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানতেন না জয়িতা। এক সিনিয়র আপুর অনুরোধেই সেখানে যান। তার যাওয়ার দিনই ছিল প্রতিযোগিতার শেষ দিন এবং শেষ ডান্স সেগমেন্ট। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই অংশ নেন তিনি। এমনকি পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশাও ছিল না।
অথচ শেষ পর্যন্ত প্রথম হয়ে পান ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’। দীর্ঘদিন পর কোনো নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে, তাও কোনো প্রস্তুতি ছাড়া এমন সাফল্য তার কাছে আরও বেশি বিশেষ হয়ে উঠেছে।
পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্তে ফিরে এসেছিল ছোটবেলার নাচ শেখার দিনগুলোর স্মৃতিও। ছোটবেলায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সময় প্রথম না হলে মন খারাপ হতো জয়িতার। এত বছর পর হঠাৎ করে সেই প্রতিযোগিতার মঞ্চে ফিরে এসে প্রথম হওয়া তাকে যেন আবার ফিরিয়ে নেয় শৈশবের দিনগুলোতে। মনে হয়েছে, এত বছর পরও নাচের প্রতি তার সেই ভালোবাসা ও টান একই রকম রয়েছে।
তার কাছে এই সম্মাননা তাই শুধু একটি পুরস্কার নয়। এটি দীর্ঘদিনের নৃত্যচর্চার স্বীকৃতি, একই সঙ্গে ছোটবেলা থেকে নাচের সঙ্গে পথচলার একটি আবেগঘন স্মৃতি। খুলনায় গ্রামের শেকড় আর ঢাকায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে জয়িতা রশীদ এখন এগিয়ে চলেছেন নিজের দুই পরিচয়কে সমানভাবে ধরে রেখে।
একদিকে কণ্ঠ দিয়ে চরিত্রকে জীবন্ত করার স্বপ্ন, অন্যদিকে নাচের মঞ্চে শরীরী অভিব্যক্তিতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ। শিল্পের এই দুই ভিন্ন মাধ্যমে পথচলা জয়িতার কাছে আলাদা হলেও উদ্দেশ্য একটাই, নিজের অনুভূতি ও সৃজনশীলতাকে নিজের মতো করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

মায়ের হাত ধরে নাচ, কার্টুনের কণ্ঠ থেকে ভয়েসওভার: জয়িতার গল্প

আপডেট সময় : ০২:২০:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

নাচে পুরস্কার, কণ্ঠে পরিচয়: জয়িতা রশীদের দুই জগতের গল্প

ছোটবেলা থেকেই নাচের সঙ্গে পথচলা। পাশাপাশি কণ্ঠ অনুকরণের সহজাত দক্ষতা থেকে ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে ভয়েসওভার শিল্পী হিসেবে আলাদা পরিচয়। শিল্পের এই দুই ভিন্ন মাধ্যমে নিজের প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়ে চলেছেন জয়িতা রশীদ। গ্রামের বাড়ি খুলনায় হলেও বেড়ে ওঠা ঢাকায়। সম্প্রতি নাচের জন্য ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’-এ সম্মানিত হয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন পর কোনো নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম হয়ে পাওয়া এই স্বীকৃতি তার কাছে হয়ে উঠেছে বিশেষ এক অর্জন।
পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে জয়িতা বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, অনুভূতিটা সত্যিই অসাধারণ। আসলে আমি আগে থেকে জানতামই না যে কোনো প্রতিযোগিতা হতে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতার আগের দিন রাতে জানতে পেরেছিলাম এবং কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই অংশগ্রহণ করেছিলাম। তাই কোনো প্রত্যাশা না রেখেই যখন প্রথম হয়েছি এবং এই সম্মাননাটি পেয়েছি, তখন আনন্দটা সত্যিই অন্যরকম ছিল। আমার দীর্ঘদিনের নাচের চর্চার জন্য এমন একটি স্বীকৃতি পাওয়াটা আমার জন্য অনেক আনন্দ ও গর্বের মুহূর্ত।
জয়িতার নাচের শুরু আরও অনেক আগে। মাত্র তিন বছর দুই মাস বয়সে তার নাচ শেখার যাত্রা শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল তার মায়ের। তিনিই ছিলেন জয়িতার নাচের প্রথম শিক্ষক এবং তাকে নাচ শেখানোর ব্যাপারে শুরু থেকেই আগ্রহী ছিলেন।
তবে শৈশবে নাচের প্রতি জয়িতার আগ্রহ খুব একটা ছিল না। বরং নৃত্যগুরুকে ভয় পেতেন, ক্লাসে যেতে চাইতেন না, এমনকি অনেক সময় কান্নাও করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সেই অবস্থান। ধীরে ধীরে নাচের সঙ্গে তৈরি হয় গভীর সম্পর্ক। একটা সময় বুঝতে পারেন, নৃত্য শুধু তার জন্য একটি শিল্প নয়, এটি নিজেকে প্রকাশ করারও একটি মাধ্যম। নাচের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি, আনন্দ ও ভালো লাগা প্রকাশ করতে পারেন তিনি। মঞ্চে নাচার সময় যে আনন্দ ও আত্মতৃপ্তি অনুভব করেন, সেটি অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করাও কঠিন।
নাচের পাশাপাশি ছোটবেলা থেকেই কণ্ঠ অনুকরণের প্রতিও ছিল তার আলাদা আগ্রহ। বিশেষ করে কার্টুন চরিত্রগুলো তাকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। ঘুম থেকে উঠে কার্টুন দেখা, খেতে বসে কার্টুন দেখা, আর প্রিয় চরিত্রগুলোর কণ্ঠ অনুকরণ করে তা মা, বাবা, ভাই-বোনদের শুনিয়ে আনন্দ পাওয়া ছিল তার শৈশবের অন্যতম অভ্যাস। মা তখনই তাকে উৎসাহ দিতেন এবং আরও ভালোভাবে অনুকরণ করার জন্য অনুপ্রাণিত করতেন। তবে তখন জয়িতা বুঝতে পারেননি, এই শখ একদিন তার পেশাগত পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠবে।
২০২০ সালে করোনাকালে সেই শখই নতুন মোড় নেয়। অনলাইনে একটি প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীর কণ্ঠ অনুকরণ করে অনেককে অংশ নিতে দেখেন জয়িতা। তার চোখে পড়ে, কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ নিয়ে তেমন কেউ অংশ নিচ্ছেন না। তখন নিজের ছোটবেলার অভ্যাসকে কাজে লাগিয়ে তিনিও অংশ নেওয়ার কথা ভাবেন।
তবে সাহস পাচ্ছিলেন না। কারণ প্রতিযোগিতায় অনেকেই ছিলেন পেশাদার, আর জয়িতা ছিলেন নিজের আগ্রহ থেকে শেখা একজন। তার ওপর কোনো কিছু করলে প্রথম হওয়ার একটা মানসিকতাও ছিল। শেষ পর্যন্ত মায়ের উৎসাহেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। মা ক্যামেরা ধরে দেন, আর জয়িতা তৈরি করেন তার প্রথম ভিডিও। অবাক করার মতোভাবে প্রথম ভিডিওতেই ভালো সাড়া পান। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয় ভিডিও করতে করতে মানুষের ভালোবাসা ও উৎসাহ বাড়তে থাকে। এভাবেই শখ থেকে ধীরে ধীরে তার ভয়েসওভার শিল্পী হিসেবে পেশাগত পথচলা শুরু হয়।
ভয়েসওভারকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার পেছনেও রয়েছে মায়ের অনুপ্রেরণা। ছোটবেলার একটি স্বপ্নের কথাও জানান জয়িতা। কোনো একটি কার্টুন চরিত্রের আনুষ্ঠানিক কণ্ঠ দেওয়ার ইচ্ছা তার দীর্ঘদিনের। পাশাপাশি ভবিষ্যতে অন্য শিল্পীরাও যেন তার কণ্ঠ বা তার তৈরি কোনো চরিত্রের কণ্ঠ অনুকরণ করেন, এমন স্বপ্নও দেখেন তিনি। ছোটবেলায় যেমন অন্যদের কণ্ঠ অনুকরণ করে আনন্দ পেতেন, তেমনি একদিন তার কণ্ঠও যেন অন্য কারও অনুপ্রেরণার কারণ হয়, সেটিই তার প্রত্যাশা।
জয়িতার মতে, একজন ভয়েসওভার শিল্পীর জন্য শুধু সুন্দর কণ্ঠস্বর থাকাই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে প্রয়োজন অভিনয় ও আবেগ প্রকাশের দক্ষতা। কারণ ভয়েসওভারে শুধু কথা বললেই হয় না, কণ্ঠের মাধ্যমে সেই অনুভূতিটাও শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে হয়। কোনো দুঃখের বিষয় স্বাভাবিকভাবে কিংবা হাসতে হাসতে বললে সেখানে সেই দুঃখের অনুভূতি ফুটে উঠবে না। আবার আনন্দময় কোনো কার্টুন চরিত্রের কণ্ঠ দেওয়ার সময় কণ্ঠে আনন্দ, উচ্ছ্বাস বা সঠিক এক্সপ্রেশন না থাকলে চরিত্রটিও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে না। তাই তার কাছে ভয়েসওভার মানে শুধু কণ্ঠ দিয়ে কথা বলা নয়, বরং কণ্ঠের মাধ্যমে অভিনয় করা।
ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র বা পরিস্থিতিতে কণ্ঠের পরিবর্তনেও তার ছোটবেলার সংগীতচর্চা ভূমিকা রেখেছে। নাচের পাশাপাশি তিনি গানও শিখেছেন সুজিত মোস্তফার কাছে। নিয়মিত রেওয়াজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন ভোকাল রেঞ্জে কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণের চর্চা করতেন। কখনো উচ্চস্বর, কখনো নিচু স্বরে কণ্ঠ নিয়ে যাওয়ার সেই অনুশীলন পরবর্তীতে ভয়েসওভারে কাজে দিয়েছে। ফলে বিভিন্ন চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠের টোন, পিচ ও ভঙ্গি পরিবর্তন করা তার জন্য তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
তবে ভয়েসওভারের জগতে পথচলাটাও পুরোপুরি সহজ ছিল না। জয়িতার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে প্রতিটি শব্দের সঠিক উচ্চারণ, উপযুক্ত আবেগ, এক্সপ্রেশন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পুরো স্ক্রিপ্ট ঠিকভাবে উপস্থাপন করা। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করায় ছোটবেলা থেকে বাংলা চর্চা তুলনামূলক কম ছিল। ফলে বাংলা শব্দের সঠিক উচ্চারণ, বিশেষ করে কিছু কঠিন শব্দ আয়ত্ত করতে তাকে বাড়তি অনুশীলন করতে হয়েছে। এখন কোনো নতুন বা কঠিন স্ক্রিপ্ট হাতে এলে আগে উচ্চারণগুলো ঠিক করে নেন। এরপর কোথায় বিরতি দিতে হবে, কোন শব্দে কতটা জোর দিতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী কী ধরনের আবেগ প্রয়োজন, সেগুলো ঠিক করে স্ক্রিপ্ট উপস্থাপন করেন।
বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কণ্ঠ তৈরি ও অনুকরণ নিয়ে আলোচনা বাড়লেও বিষয়টিকে শুধুই হুমকি হিসেবে দেখছেন না জয়িতা। তার মতে, প্রযুক্তি একটি কণ্ঠকে কাছাকাছি অনুকরণ করতে পারলেও একজন মানুষের মতো করে চরিত্রের পরিস্থিতি ও অনুভূতি ধারণ করে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করার জায়গাটি আলাদা। মানুষের আবেগ, অভিনয় ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তিই একজন পেশাদার ভয়েসওভার শিল্পীকে আলাদা করে বলে মনে করেন তিনি।
নাচ ও ভয়েসওভার, দুটি মাধ্যমকে আলাদা হলেও এর মূল জায়গায় মিল খুঁজে পান জয়িতা। তার ভাষায়, “আমি যখন নাচি, তখন আমার শরীর কথা বলে; আর যখন ভয়েসওভার করি, তখন আমার কণ্ঠ কথা বলে।” নাচে শরীরের মুভমেন্ট, মুখের অভিব্যক্তি ও অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে অনুভূতি প্রকাশ করেন, আর ভয়েসওভারে একই কাজ করেন কণ্ঠের ওঠানামা, টোন ও আবেগ দিয়ে। তার কাছে নাচ ও ভয়েসওভার আলাদা দুটি জগৎ হলেও দুটির কেন্দ্রেই রয়েছে অভিব্যক্তি ও অনুভূতি।
তবে ভয়েসওভার করার অভিজ্ঞতা তার নাচের পরিবেশনায় সরাসরি বড় কোনো প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন না তিনি। দুটো মাধ্যমকে আলাদাভাবেই দেখেন জয়িতা। তার কাছে একটির অভিজ্ঞতা অন্যটির ওপর সরাসরি নির্ভরশীল নয়।
পেশাগত ও পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যেও নাচের চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্লাস থাকে। মাঝখানে এক থেকে দেড় ঘণ্টার মতো সময় পেলেই সেই অবসরটুকু আড্ডায় না কাটিয়ে নাচের অনুশীলন কিংবা ডান্স ভিডিও তৈরিতে কাজে লাগান। তার বিশ্বাস, নাচের জন্য সবসময় দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট অবসর সময়কেও কাজে লাগিয়ে চর্চা ধরে রাখা সম্ভব।
নাচের প্রতিযোগিতার সঙ্গেও জয়িতার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। তবে প্রায় চার বছর আগে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া অনেকটাই বন্ধ করে দেন। এর পেছনে রয়েছে তার নৃত্যগুরুর একটি কথা। একসময় গুরু তাকে বলেছিলেন, জয়িতা, তুই আর কত প্রতিযোগিতা করবি? অনেক পুরস্কার তো পেয়েছিস, এবার অন্যদেরও সুযোগ দে।
কথাটি জয়িতার মনে দাগ কাটে। এরপর নতুন যারা আসছে তাদেরও সামনে আসার সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। ফলে প্রতিযোগিতার মঞ্চ থেকে অনেকটাই দূরে ছিলেন। এবারের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াটাও ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক। প্রতিযোগিতার বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানতেন না জয়িতা। এক সিনিয়র আপুর অনুরোধেই সেখানে যান। তার যাওয়ার দিনই ছিল প্রতিযোগিতার শেষ দিন এবং শেষ ডান্স সেগমেন্ট। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই অংশ নেন তিনি। এমনকি পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশাও ছিল না।
অথচ শেষ পর্যন্ত প্রথম হয়ে পান ‘স্বর্ণ মুকুট নৃত্যরত্ন পুরস্কার ২০২৫’। দীর্ঘদিন পর কোনো নৃত্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে, তাও কোনো প্রস্তুতি ছাড়া এমন সাফল্য তার কাছে আরও বেশি বিশেষ হয়ে উঠেছে।
পুরস্কার পাওয়ার মুহূর্তে ফিরে এসেছিল ছোটবেলার নাচ শেখার দিনগুলোর স্মৃতিও। ছোটবেলায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সময় প্রথম না হলে মন খারাপ হতো জয়িতার। এত বছর পর হঠাৎ করে সেই প্রতিযোগিতার মঞ্চে ফিরে এসে প্রথম হওয়া তাকে যেন আবার ফিরিয়ে নেয় শৈশবের দিনগুলোতে। মনে হয়েছে, এত বছর পরও নাচের প্রতি তার সেই ভালোবাসা ও টান একই রকম রয়েছে।
তার কাছে এই সম্মাননা তাই শুধু একটি পুরস্কার নয়। এটি দীর্ঘদিনের নৃত্যচর্চার স্বীকৃতি, একই সঙ্গে ছোটবেলা থেকে নাচের সঙ্গে পথচলার একটি আবেগঘন স্মৃতি। খুলনায় গ্রামের শেকড় আর ঢাকায় বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে জয়িতা রশীদ এখন এগিয়ে চলেছেন নিজের দুই পরিচয়কে সমানভাবে ধরে রেখে।
একদিকে কণ্ঠ দিয়ে চরিত্রকে জীবন্ত করার স্বপ্ন, অন্যদিকে নাচের মঞ্চে শরীরী অভিব্যক্তিতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ। শিল্পের এই দুই ভিন্ন মাধ্যমে পথচলা জয়িতার কাছে আলাদা হলেও উদ্দেশ্য একটাই, নিজের অনুভূতি ও সৃজনশীলতাকে নিজের মতো করে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।