কঠোর পরিশ্রমে সাফল্য, মাসে লাখ টাকা আয় মাইনুলের
- আপডেট সময় : ০৭:২০:১৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ ৫ বার পড়া হয়েছে
বাবাকে হারানোর পর জীবিকার পথ খুঁজতে চাকরির জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঘুরেছেন নারায়ণগঞ্জের মাইনুল ইসলাম খান। অসুস্থ মাকে রাতে একা রাখতে হবে বলে নয় হাজার টাকা বেতনের একটি চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। পরে মায়ের জোগাড় করে দেওয়া ৪০ হাজার টাকায় কম্পিউটার কিনে নিজের প্রযুক্তিজ্ঞানকে পেশায় কাজে লাগানোর চেষ্টা শুরু করেন। সেই মাইনুল এখন মিডিয়া বায়ার ও গ্রোথ স্ট্র্যাটেজিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সব কাজ মিলিয়ে বর্তমানে তাঁর মোট মাসিক আয় প্রায় তিন থেকে চার হাজার মার্কিন ডলার।
মাইনুলের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় অবশ্য আরও আগে। ২০১২ সাল থেকে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। তখন অনানুষ্ঠানিকভাবে ফেসবুকসংক্রান্ত সমস্যা, অনলাইন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের শিকার মানুষদের সহায়তা করতেন। বিশেষ করে কয়েকজন নারীর অনলাইন সমস্যার সমাধানে সহযোগিতা করার অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি। এভাবে একসময় গণমাধ্যম ও বিনোদনজগতের মানুষের সঙ্গে কাজের সুযোগ হয়। সংগীতশিল্পীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়েও সহযোগিতা করতেন।
সেসব কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেও তখনো নিয়মিত উপার্জনের পেশায় যুক্ত হননি মাইনুল। দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন একজন ইসলামি আলেম। বাবার স্নেহে বড় হওয়া মাইনুলকে তখন সংসারের আর্থিক দায়িত্ব নিয়ে ভাবতে হয়নি। হিফজ সম্পন্ন করার পর আলিয়া ধারায় ফাজিল সম্পন্ন করেন তিনি।
২০২৩ সালের ৭ এপ্রিল বাবার মৃত্যু তাঁর জীবনের পরিস্থিতি বদলে দেয়। মাইনুলের ভাষ্য, শোক সামলে ওঠার আগেই জীবিকার চিন্তা সামনে আসে। কী করবেন, কোথায় কাজ পাবেন, তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। পরিচিতদের কাছে সহযোগিতা চেয়েও প্রত্যাশিত সাড়া পাননি বলে জানান তিনি।
নারায়ণগঞ্জের আশপাশে পোশাক কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির চেষ্টা করেন মাইনুল। অভিজ্ঞতা না থাকায় কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অফিস সহকারী হিসেবেও সুযোগ খুঁজেছিলেন। শেষ পর্যন্ত একটি পোশাক কারখানায় মাসে নয় হাজার টাকা বেতনের প্রস্তাব পান। তবে সেখানে দিন ও রাতের পালায় কাজ করতে হতো।
বাবার মৃত্যুর পর অসুস্থ মাকে রাতে বাড়িতে একা রেখে কাজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তিনি। ওই চাকরিতে যোগ দেওয়া হয়নি। তখন আগে থেকে জানা আইটি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাজকে আয়ের পথ হিসেবে গড়ে তোলার কথা ভাবেন।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ছিল একটি কম্পিউটার। কিন্তু কেনার টাকা ছিল না। মাইনুল জানান, তাঁর পরিকল্পনা নিয়ে নিকটজনদের কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। এ সময় মা তাঁর পাশে দাঁড়ান। জোগাড় করে দেন ৪০ হাজার টাকা। মায়ের সেই কথাটি এখনো মনে রেখেছেন তিনি—‘তুই পারবি বাবা।’
মায়ের দোয়ার স্মৃতিও তাঁর কাছে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। মাইনুলের বর্ণনায়, নামাজের পর মা কেঁদে কেঁদে দোয়া করতেন, ‘আল্লাহ, তুমি আমার ছেলের হালাল রিজিকের ব্যবস্থা করে দাও।’
সেই টাকা দিয়ে কেনা ল্যাপটপটি প্রায় এক মাসের মাথায় নষ্ট হয়ে যায়। চেষ্টা করেও সেটি ঠিক করতে পারেননি। কাজ শেখার শুরুতেই আবার বাধা আসে। মা দ্বিতীয়বার সহযোগিতা করলে একটি পুরোনো ডেস্কটপ কম্পিউটার কেনেন তিনি। সেটি দিয়েই নতুন করে অনুশীলন শুরু হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর এই পথচলায় মায়ের পাশাপাশি জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মুহাম্মদ মিলনের সহযোগিতার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন মাইনুল। ‘সখী ভালোবাসা কারে কয়’ গানখ্যাত এই শিল্পীর কাছ থেকে নিজের পেশাগত যাত্রায় ব্যাপক সহযোগিতা পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
নিজের দক্ষতা গড়ে তুলতে ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটের ডিজিটাল মার্কেটিং ডিপ্লোমা কোর্সে ভর্তি হন মাইনুল। সেখানে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন বা এসইও শেখেন। অনপেজ, অফপেজ ও টেকনিক্যাল এসইও নিয়ে ফাইভার ও আপওয়ার্কে কাজ করতে থাকেন। একপর্যায়ে ফাইভার অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেলে কাজের ধারাবাহিকতায় ধাক্কা আসে।
এরপর শেখার পরিধি বাড়ান তিনি। আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষকদের কোর্সের মাধ্যমে গুগল অ্যাডস, মেটা অ্যাডস ও ওয়েব অ্যানালিটিক্স নিয়ে পড়াশোনা ও অনুশীলন করেন। বিজ্ঞাপনের ফলাফল বিশ্লেষণ এবং ক্লায়েন্টের ব্যবসার প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করার দিকে মনোযোগ দেন।
২০২৩ সালের আগস্টে একটি জাতীয় দৈনিকে চাকরির সুযোগ পান মাইনুল। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাসিক বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকা। সেখানে সিনিয়র ডিজিটাল মার্কেটিং অ্যান্ড কনটেন্ট ডেভেলপার হিসেবে যোগ দেন। বাবার মৃত্যুর পর শুরু হওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে এই চাকরি তাঁকে নিয়মিত আয়ের সুযোগ করে দেয়।
চাকরির পাশাপাশি নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ার চিন্তা থেকে এক সহপাঠীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি মার্কেটিং এজেন্সি চালু করেন। মাইনুল জানান, একসময় সেখানে প্রায় ১৫ জন কাজ করতেন। এজেন্সিতে পুরো সময় দেওয়ার জন্য প্রায় চার মাস চাকরি করার পর দৈনিকটি ছেড়ে দেন তিনি।
তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আন্দোলনের সময় ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে এজেন্সির কাজে বড় ধাক্কা লাগে। মাইনুলের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটি তখন মূলত চারজন ক্লায়েন্টের কাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুজন কাজ বন্ধ করে দেন। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ধীরে ধীরে এজেন্সির কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হয়।
এজেন্সি বন্ধ হওয়ার পর চাকরিও ছিল না তাঁর। কিছুদিন কাজহীন অবস্থায় কাটে। হতাশার মধ্যেও নিজের দক্ষতা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। গুগল অ্যাডস, মেটা অ্যাডস ও ওয়েব অ্যানালিটিক্সে শেখা বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে আয়ত্ত করতে স্কিলআপারে শামীম হোসাইনের প্রশিক্ষণে যুক্ত হন। অনলাইনে ক্লাসের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষকদের কাছ থেকেও শিখতে থাকেন। বই পড়া এবং কনটেন্ট মার্কেটিং নিয়েও পড়াশোনা চালিয়ে যান।
২০২৪ সালের শেষের দিকে একটি বহুজাতিক প্রসাধনী প্রতিষ্ঠানে মিডিয়া বায়ার হিসেবে কাজের সুযোগ পান মাইনুল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে মাসে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মার্কিন ডলারের বিজ্ঞাপন বাজেট পরিচালনা করতেন। বড় বাজেটের প্রচারণা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বিজ্ঞাপনের পরিকল্পনা, ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও ফলাফল বিশ্লেষণে অভিজ্ঞতা বাড়তে থাকে।
মাইনুল জানান, বর্তমানে দেশি ও বিদেশি ক্লায়েন্ট মিলিয়ে মাসে প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ হাজার মার্কিন ডলারের বিজ্ঞাপন বাজেট পরিচালনা করেন তিনি। মিডিয়া বায়িংয়ের পাশাপাশি ব্যবসার প্রবৃদ্ধির কৌশল নিয়েও কাজ করছেন। এসব কাজ এবং ওয়েব ডেভেলপমেন্ট মিলিয়ে তাঁর মোট মাসিক আয় প্রায় তিন থেকে চার হাজার মার্কিন ডলার বলে জানান তিনি।
পেশাগত কাজের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়তে দেখে প্রথমে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়েছিলেন মাইনুল। পরে প্রযুক্তিটি শেখার সিদ্ধান্ত নেন। প্রম্পট লেখা, বিভিন্ন এআই মডেলের ব্যবহার এবং নিজের কাজে সেগুলো প্রয়োগের চেষ্টা করেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, এআইয়ের সহায়তায় কিছু কাজ আগের চেয়ে অনেক কম সময়ে করা সম্ভব হচ্ছে।
এখন ক্লায়েন্টের প্রয়োজন অনুযায়ী ওয়েবসাইট তৈরির কাজও করছেন তিনি। নেক্সট জেএস, ওয়ার্ডপ্রেস ও শপিফাই ব্যবহার করে ওয়েব ডেভেলপমেন্টের কাজে এআইকে সহায়ক হিসেবে যুক্ত করেছেন। এই নতুন কাজের সুযোগ তৈরিতে এআই শেখার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন মাইনুল।
প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে শেখার অভ্যাস ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, নিজের পেশায় এআই কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা বুঝে ব্যবহার শেখা প্রয়োজন। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মাইনুল বলেন, ‘এআই আমার শত্রু নয়, এআই এখন আমার পরম বন্ধু।’










